ডায়োডের ইসিহাস


ডায়োডের ইসিহাস 


 উনিশ শতকের শেষের দিকে তড়িৎ প্রবাহ একমুখীকরণ বা রেকটিফিকেশনের দুই ধরনের কৌশল আবষ্কৃত হয়—থার্মায়োনিক ডায়োড(ভ্যাকুয়াম টিউব) ও ক্রিস্টাল ডায়োড। যদিও ভ্যাকুয়াম টিউব অর্ধপরিবাহী ক্রিস্টাল ডায়োডের পূর্বে প্রায়োগিক সাফল্য লাভ করে, এ দুই ধরনের গঠন একই সাথে বিকশিত হয়েছিল। ১৮৭৩ সালে ফ্রেডিক গাথরি প্রথম থার্মিয়োনিক ডায়োডের মূলনীতি আবিষ্কার করেন। [১] তিনি দেখেন যে ভূমিতে (Ground) সংযুক্ত এক টুকরো সাদা গরম লোহাকে একটি ধনাত্নক চার্জ বিশিষ্ট ইলেকট্রোস্কোপের কাছাকাছি নিয়ে আসা হলে কোন স্পর্শ বা সংযোগ ছাড়াই তা চার্জশূণ্য হয়ে যায়। কিন্তু ইলেক্ট্রোস্কপে ঋণাত্মক চার্জ দেওয়া হলে প্রক্রিয়াটির পুনরাবৃত্তি ঘটে না। অর্থাৎ এ প্রক্রিয়ায় তড়িৎ প্রবাহ বিভব পার্থক্যের সাপেক্ষে একমুখী। ১৮৮০ সালে বৈদ্যুতিক বাতির ফিলামেন্ট নিয়ে কাজ করার সময় তত্ত্বটি স্বতন্ত্রভাবে পুনঃআবিষ্কার করেন টমাস আলভা এডিসন। তিনি একটি বদ্ধ বায়ুশূণ্য কাচের পাত্রে একটি কার্বন ফিলামেন্ট ও একটি ধনাত্মকভাবে চার্জিত ধাতব পাত নিয়ে পরীক্ষণ চালান এবং দেখতে পান যে ফিলামেন্ট থেকে ভ্যাকুয়ামের মধ্য দিয়ে চার্জের নির্গমন ঘটছে এবং ধাতব পাতে সঞ্চিত হয়ে তড়িৎ প্রবাহের সৃষ্টি করছে। এডিসনএ ঘটনার নাম দেন এডিসন ইফেক্ট এবং এর উপর ভিত্তি করে বিভব পার্থক্য মাপার যন্ত্র ভোল্টমিটারের উন্নয়ন ঘটান। ১৮৮৪ সালে এডিসন তার আবিষ্কৃত যন্ত্রটি পেটেন্ট করেন[২]। এর বছর বিশেক পরে মার্কোনি কোম্পানির বিজ্ঞান উপদেষ্টা ও এডিসন কোম্পানির প্রাক্তন কর্মচারী জন এমব্রোস ফ্লেমিং রেডিও সংকেতের মর্মোদ্ধারে এডিসন ইফেক্টের গুরুত্ব অনুধাবন করেন এবং ১৯০৪ সালে ব্রিটেন[৩] ও ১৯০৫ সালে যুক্তরাষ্ট্র থেকে[৪] এ ব্যাপারে দুইটি পেটেন্ট লাভ করেন। এ আবিষ্কারের পর থেকে রেকটিফিকেশনের কাজে ভ্যাকুয়াম টিউবের ব্যাপক ব্যবহার শুরু হয়।

অন্যদিকে জার্মান পদার্থবিজ্ঞানী ফার্দিনান্দ ব্রাউন ১৮৭৪ সালে ক্রিস্টালের রেকটিফাই করার ধর্মকে আবিষ্কার করেন। ১৯০৬ সালে খনিজ ক্রিস্টাল গ্যালেনা (লেড সালফাইড) থেকে প্রথম অর্ধ পরিবাহী ডায়োড সৃষ্টি হয়। এক্ষেত্রে ক্রিস্টালটিকে বর্তনীতে সংযুক্ত করা হত অত্যন্ত সরু ধাতব তার ব্যবহার করে, গঠনগত সাদৃশ্যের কারণে যার নাম দেওয়া হয় ক্যাটস হুইস্কার বা বেড়ালের গোঁফ। ১৮৯৪ সালে বাঙালি বিজ্ঞানী জগদীশচন্দ্র বসু ক্রিস্টাল ডায়োড ব্যবহার করে রেডিও সংকেত পুনরুদ্ধার করতে সক্ষন হন[৫]। ১৯০৩ সালে সিলিকন ক্রিস্টাল ডায়োড-ভিত্তিক রেডিও গ্রাহকের প্রায়োগিক রূপ দেন গ্রিনলিফ উইটিয়ার পিকার্ড, যা তিনি ১৯০৬ সালে পেটেন্ট করেন[৬]। তবে অর্ধপরিবাহী ক্রিস্টালের বিশুদ্ধতা আশানুরূপ না থাকায় তা জনপ্রিয়তা লাভ করতে পারেনি।

পঞ্চাশের দশকে অর্ধপরিবাহী ক্রিস্টাল তৈরির পদ্ধতির উন্নতি ঘটলে যুক্তরাষ্ট্রের বেল ল্যাবে জার্মেনিয়াম-ভিত্তিক ডায়োড তৈরি শুরু হয়, যা ক্রমশ ভ্যাকুয়াম টিউবকে পেছনে ফেলে এগিয়ে যেতে থাকে। বর্তমানে বেশির ভাগ ডায়োড সিলিকন থেকে প্রস্তুত করা হয়, তবে প্রয়োগের উপর নির্ভর করে অন্যান্য অর্ধপরিবাহীও (যেমন জার্মেনিয়াম, সিলিকন কার্বাইড, III-V গ্যালিয়াম যৌগ ইত্যাদি) ব্যবহৃত হয়। [৭]

থার্মায়োনিক ডায়োড[সম্পাদনা]

ভ্যাকুয়াম ডায়োডের প্রতীক। উপর থেকে নিচেঃ অ্যানোড, ক্যাথোড এবং হিটার ফিলামেন্ট।

থার্মায়োনিক ডায়োড হলো থার্মায়োনিক ভালভ জাতের যন্ত্র যা ভ্যাকুয়াম টিউব বা ভালভ নামেও পরিচিত। এটি মূলত একটি বায়ুশূণ্য কাচের টিউবের ভেতরে বিপরীত বিভবের ইলেকট্রোডের (অ্যানোড ও ক্যাথোড) সমাবেশ। একটি হিটার ফিলামেন্টের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত বিদ্যুতের সাহায্যে ক্যাথোডকে উত্তপ্ত করে তোলা হয় যা থেকে ইলেকট্রনের থার্মায়োনিক নির্গমন ঘটে। থার্মায়োনিক নির্গমন বৃদ্ধির জন্য ক্যাথোডের উপর নিম্ন কার্যক্ষমতা-সম্পন্ন (ওয়ার্ক ফাংশন) বেরিয়াম ও স্ট্রোন্টিয়াম অক্সাইডের মিশ্রণের প্রলেপ দেওয়া হয়। অ্যানোড ধনাত্মকভাবে চার্জিত থাকে, ফলে তা ক্যাথোড থেকে থার্মায়োনিক নির্গমনে বেরিয়ে আসা ইলেকট্রনকে আকর্ষণ করে। এ ধরনের ডায়োডে বিপরীতমুখী তড়িৎ প্রবাহের কোন সম্ভাবনাই থাকে না। বিশ শতকের প্রথমার্ধ্বে থার্মিয়োনিক ভালব ডায়োড বিভিন্ন অ্যানালগ সরঞ্জামে, যেমন টিভি, রেডিও ইত্যাদিতে, এমনকি কম্পিউটার ও অন্যান্য স্বয়ংক্রিয় বর্তনীতে অ্যানালগ সংকেত ও শক্তি পরিবহনে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়। ষাটের দশকে অর্ধপরিবাহী ডায়োডের আবিষ্কার হলে এর প্রয়োজন কমতে শুরু করে। বর্তমানে ভালভ ডায়োড ইলেকট্রিক গিটারের রেকটিফায়ার এবং হাই অ্যান্ড অডিও অ্যামপ্লিফায়ার ও হাই ভোল্টের যন্ত্রপাতিতে এর কিছু ব্যবহার রয়েছে।

অর্ধপরিবাহী ডায়োড[সম্পাদনা]

অর্ধপরিবাহী ডায়োড ও তার প্রতীক
একটি ডায়োডের খুব কাছে থেকে নেওয়া চিত্র যাতে বর্গাকৃতির অর্ধপরিবাহক স্ফটিকটি দেখা যাচ্ছে।

অধিকাংশ আধুনিক ডায়োডই অর্ধপরিবাহী জাংশন তত্ত্বের উপর নির্ভর করে বানানো হয়। এদের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো P-N জাংশন ডায়োড। এধরনের ডায়োড অর্ধ পরিবাহীর ক্রিস্টাল যেমন সিলিকন থেকে নির্মিত হয়। ক্রিস্টালের এক অংশে কিছু অপদ্রব্য মেশানো হয় (ডোপায়ন) যাতে এমন একটা জায়গা তৈরি হয় যাতে ঋণাত্নক চার্জের বাহক বা ইলেকট্রন অধিক পরিমাণে থাকে; এঅংশকে বলা হয় এন(N)-টাইপ অর্ধপরিবাহী। ক্রিস্টালের অপর অংশে ভিন্নধর্মী অপদ্রব্যের সাহায্যে ধনাত্নক চার্জের ঘনত্ব বাড়িয়ে তোলা হয়। এ অংশটিকে বলা হয় পি(P)-টাইপ অর্ধপরিবাহী। এই দুইটি অংশের (পি ও এন) সংযোগস্থলকে বলে পি-এন জাংশন যেখানে ডায়োডের মূল কাজগুলো সংগঠিত হয়ে থাকে। ডায়োডে তড়িৎ প্রবাহের দিক হচ্ছে P টাইপ অর্ধপরিবাহী থেকে N টাইপ অর্ধপরিবাহক দিকে। এর বিপরীত দিকে তড়িৎ প্রবাহিত হতে পারে না।

Post a Comment

Previous Post Next Post